শিশুদের চিকেন পক্স: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

শিশুদের চিকেন পক্স: লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

শিশুদের-চিকেন-পক্স-নবজাতক-হাসপাতাল
শিশুদের-চিকেন-পক্স-নবজাতক-হাসপাতাল

শিশুর শরীরে হঠাৎ জ্বরের পর ছোট ছোট ফোস্কা উঠলে অনেক বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। এটি চিকেন পক্স বা জলবসন্ত হতে পারে। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে এটি কয়েক দিনেই সেরে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা হতে পারে এবং রোগটি খুব সহজে অন্যদের মধ্যে ছড়ায়। এই লেখায় শিশুদের চিকেন পক্সের লক্ষণ, কারণ, যত্ন, চিকিৎসা, কখন ডাক্তার দেখাবেন এবং প্রতিরোধের উপায় সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

চিকেন পক্স কী?

চিকেন পক্স বা জলবসন্ত হলো ভ্যারিসেলা-জস্টার ভাইরাসের সংক্রমণে হওয়া একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। এতে শরীরজুড়ে চুলকানিযুক্ত র‍্যাশ ওঠে, যা পরে পানিভরা ফোস্কায় রূপ নেয় এবং শেষে শুকিয়ে মামড়ি পড়ে। এটি ভাইরাসজনিত রোগ, তাই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ভাইরাস মারা যায় না।

শিশুদের চিকেন পক্স কেন হয়? (কারণ ও ছড়ানোর উপায়)

যে শিশুর আগে চিকেন পক্স হয়নি এবং টিকা নেওয়া নেই, সে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাসটি ছড়ায়:

  • আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ক্ষুদ্র কণার সঙ্গে
  • ফোস্কার তরলের সরাসরি সংস্পর্শে
  • আক্রান্তের ব্যবহৃত জিনিস, যেমন খেলনা, তোয়ালে ও বিছানার চাদরের মাধ্যমে

ছোঁয়াচে থাকার সময়: ফোস্কা ওঠার ১-২ দিন আগে থেকে শুরু করে সব ফোস্কা শুকিয়ে মামড়ি না হওয়া পর্যন্ত শিশু অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। সংস্পর্শে আসার পর লক্ষণ দেখা দিতে সাধারণত ১০ থেকে ২১ দিন লাগে। এই অঞ্চলে শীতের শেষ ও বসন্তে রোগটি বেশি দেখা যায়, তবে ঋতু পরিবর্তনের সময় বা অসময়েও হতে পারে।

শিশুদের চিকেন পক্সের লক্ষণ

শুরুতে ১-২ দিন সাধারণ জ্বর-জ্বর ভাব থাকে, এরপর র‍্যাশ ওঠে।

প্রাথমিক লক্ষণ:

  • জ্বর আসা
  • শরীরে ব্যথা বা দুর্বলতা
  • খাবারে অনীহা
  • মাথাব্যথা
  • কিছু শিশুর ক্ষেত্রে গলা ব্যথা বা অস্বস্তি

র‍্যাশ ও ফোস্কা:

  • চুলকানিযুক্ত লালচে র‍্যাশ
  • পানি ভরা ছোট ফোস্কা
  • মুখ, বুক, পিঠ, মাথার ত্বক বা হাত-পায়ে দানা
  • এক জায়গায় নতুন ফোস্কা উঠতে থাকে, তাই একই সময়ে লাল দাগ, ফোস্কা ও শুকনো মামড়ি, তিনটিই দেখা যেতে পারে

জ্বর আগে উঠবে নাকি র‍্যাশ আগে? সাধারণত জ্বর ও ক্লান্তি আগে বা র‍্যাশ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়। তবে ছোট শিশুদের অনেক সময় প্রথম লক্ষণই হয় র‍্যাশ।

চিকেন পক্স সংক্রমণের পর্যায়গুলি

  1. শুরুর পর্যায়: হালকা জ্বর, ক্লান্তি, খিদে কমে যাওয়া
  2. লাল দানা: ত্বকে ছোট লাল দাগ বা ফুসকুড়ি
  3. ফোস্কা: দানাগুলো পানিভরা ফোস্কায় পরিণত হয় এবং তীব্র চুলকায়
  4. মামড়ি: ফোস্কা শুকিয়ে মামড়ি পড়ে। সাধারণত ৭-১০ দিনের মধ্যে সব ফোস্কা শুকিয়ে যায়

রোগ নির্ণয়: চিকেন পক্স কীভাবে শনাক্ত করা হয়

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডাক্তার র‍্যাশের ধরন ও উপসর্গ দেখেই রোগ শনাক্ত করেন। সন্দেহ থাকলে বা শিশু ঝুঁকিতে থাকলে ফোস্কা থেকে নমুনা নিয়ে ল্যাব পরীক্ষা করা হতে পারে।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

  • ১ বছরের কম বয়সী শিশু ও নবজাতক
  • টিকা না নেওয়া শিশু
  • রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম বা আগে থেকে জটিল রোগ আছে এমন শিশু
  • গর্ভবতী নারী, যাঁরা আগে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হননি বা টিকা নেননি

সম্ভাব্য জটিলতা

  • ফোস্কা চুলকিয়ে ক্ষত হয়ে ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
  • পানিশূন্যতা
  • নিউমোনিয়া
  • বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহ
  • ভবিষ্যতে একই ভাইরাস থেকে হার্পিস জস্টার (শিংলস) হওয়ার সম্ভাবনা, কারণ ভাইরাস শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যেতে পারে

শিশুদের চিকেন পক্স হলে কীভাবে যত্ন নেবেন?

শিশুদের চিকেন পক্সের চিকিৎসা মূলত লক্ষণ কমানো ও জটিলতা এড়ানোর যত্ন। ভাইরাস নিজে থেকেই সেরে যায়।

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন।
  • পানি ও তরল খাবার বেশি দিন: বুকের দুধ চালিয়ে যান। দুধ খাওয়া যাবে, কোনো বাধা নেই।
  • জ্বর নিয়ন্ত্রণ করুন: ডাক্তারের পরামর্শমতো প্যারাসিটামল দিন। শিশুর ওজন অনুযায়ী মাত্রা ডাক্তার ঠিক করে দেবেন।
  • চুলকানি কমানোর ব্যবস্থা করুন: কুসুম গরম বা ঠান্ডা পানিতে হালকা গোসল করানো যায়, গোসলের পর নরম তোয়ালে দিয়ে চেপে মুছুন, ঘষবেন না। ক্যালামাইন লোশন বা চুলকানির অন্য কোনো ক্রিম ও ওষুধ ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ব্যবহার করুন।
  • ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরান এবং শিশুর নখ ছোট রাখুন। খুব ছোট শিশুর হাতে নরম গ্লাভস পরানো যায়।
  • খাবার-দাবার: সহজপাচ্য ও নরম খাবার দিন। মুখের ভেতর ফোস্কা থাকলে ঝাল, নোনতা ও টক খাবার এড়ান। কোনো নির্দিষ্ট খাবার চিকেন পক্সে নিষিদ্ধ, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তাই শিশুকে খাবার থেকে বঞ্চিত করবেন না।

চিকেন পক্স হলে কী করা উচিত নয়?

  • ফোস্কা খোঁচানো বা ফাটানো যাবে না
  • নিজে নিজে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা যাবে না
  • ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া যাবে না
  • অ্যাসপিরিন দেওয়া যাবে না, কারণ এটি শিশুদের গুরুতর জটিলতা ঘটাতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ইবুপ্রোফেনও দেবেন না
  • শিশুকে স্কুল বা ডে-কেয়ারে পাঠানো যাবে না
  • অন্য শিশু, নবজাতক, গর্ভবতী নারী বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন মানুষের কাছে নেওয়া যাবে না

ওষুধ, ক্রিম ও ঘরোয়া চিকিৎসা নিয়ে সতর্কতা

শিশুদের চিকেন পক্সের জন্য কোন ওষুধ ভালো? এর কোনো একক ওষুধ নেই। জ্বর ও চুলকানির জন্য লক্ষণভিত্তিক ওষুধ ডাক্তার ঠিক করে দেন। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে ডাক্তার প্রয়োজন মনে করলে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিতে পারেন, যা সাধারণত র‍্যাশ ওঠার প্রথম দিকে শুরু করলে বেশি কাজ করে।

হোমিও বা ঘরোয়া প্রলেপ: এগুলোর কার্যকারিতার পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। অপরিষ্কার বা অজানা কিছু ফোস্কায় লাগালে ত্বকে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। এসব ব্যবহারের আগে শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন, আর এর জন্য ডাক্তার দেখাতে দেরি করবেন না।

চিকেন পক্স কতদিন স্থায়ী হয়?

সাধারণত জ্বর কয়েক দিন থাকে এবং ৭-১০ দিনের মধ্যে ফোস্কাগুলো শুকিয়ে মামড়ি পড়ে। যতক্ষণ না সব ফোস্কা শুকিয়ে যায়, শিশুকে বাড়িতে রাখুন।

দাগ দূর করতে কী করবেন?

চুলকানোর ফলে গভীর ক্ষত হলে দাগ থেকে যেতে পারে। মামড়ি জোর করে তুলবেন না, নিজে থেকে পড়তে দিন। মামড়ি পড়ার পর ত্বক ময়েশ্চারাইজ করুন এবং সরাসরি রোদ থেকে বাঁচান। বেশিরভাগ দাগ সময়ের সঙ্গে হালকা হয়ে যায়। দাগ গভীর হলে ত্বক বিশেষজ্ঞকে দেখান।

কখন ডাক্তার দেখাবেন? (বিপদচিহ্ন)

  • জ্বর অনেক বেশি বা দীর্ঘদিন থাকে
  • শিশু খুব দুর্বল, নিস্তেজ বা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম থাকে
  • শ্বাসকষ্ট হয়
  • বারবার বমি হয়
  • ফোস্কার চারপাশ লাল, ফুলে যায়, গরম লাগে বা পুঁজ বের হয়
  • চোখের কাছে র‍্যাশ হয়
  • শিশুর বয়স ১ বছরের কম
  • শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, বা আগে থেকেই জটিল রোগ আছে
  • খিঁচুনি বা ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া

চিকেন পক্স প্রতিরোধের উপায়

টিকা: চিকেন পক্স প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভ্যারিসেলা টিকা। সাধারণত শিশুদের দুটি ডোজ দেওয়া হয়। কোন বয়সে কখন দেবেন এবং বাংলাদেশে কোথায় পাবেন, তা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে জেনে নিন। টিকা ছাড়া প্রতিরোধ কঠিন, কারণ রোগটি লক্ষণ প্রকাশের আগেই ছড়াতে পারে।

সংস্পর্শে এলে: আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে এলে এবং শিশু বা পরিবারের কেউ টিকা না নিয়ে থাকলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকা বা বিশেষ ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য করে।

পরিবার ও স্কুলের জন্য টিপস:

  • আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখুন
  • তার তোয়ালে, বিছানা ও খেলনা আলাদা রাখুন এবং ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন
  • নিয়মিত সাবান-পানিতে হাত ধুতে শেখান
  • স্কুলে জানান, যাতে অন্য অভিভাবকরা সতর্ক থাকতে পারেন

চিকেন পক্স নিয়ে মিথ ও তথ্য

  • মিথ: গোসল করালে ফোস্কা বেড়ে যায়। তথ্য: হালকা গোসল চুলকানি কমায় ও ত্বক পরিষ্কার রাখে।
  • মিথ: এই সময় দুধ বা নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া যাবে না। তথ্য: এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
  • মিথ: একবার হলে আর কখনো ভাইরাসের প্রভাব থাকে না। তথ্য: ভাইরাস সুপ্ত থাকতে পারে এবং পরে শিংলস হতে পারে।

নবজাতক হাসপাতাল কেন বেছে নেবেন?

বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতাল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত একটি বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেখানে নবজাতক ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। শিশুর জ্বর, ত্বকের র‍্যাশ বা চিকেন পক্সের সন্দেহজনক উপসর্গে শিশু বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত নার্সদের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া যায়।

ঠিকানা: হসপিটাল টাওয়ার, বাড়ি ই-২০৬/১, সাইনবোর্ড মোড়, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ-১৪৩০ যোগাযোগ: +৮৮ ০১৭৯০৩৬৮৬৫৬

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

১. শিশুদের চিকেন পক্স হলে কী করবেন? বিশ্রাম, তরল খাবার, জ্বরের জন্য ডাক্তারের পরামর্শে প্যারাসিটামল এবং চুলকানি কমানোর যত্ন নিন। ফোস্কা খোঁচাবেন না, আর শিশুকে বাড়িতে রাখুন।

২. চিকেন পক্স কীভাবে ছড়ায়? কাশি-হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে এবং ফোস্কার তরলের সংস্পর্শে ছড়ায়।

৩. চিকেন পক্স কতদিন স্থায়ী হয়? সাধারণত ৭-১০ দিনে সব ফোস্কা শুকিয়ে যায়।

৪. চিকেন পক্স হলে কি দুধ খাওয়া যাবে? হ্যাঁ। বুকের দুধ ও সাধারণ দুধ খাওয়ানো যাবে। বুকের দুধ চালিয়ে যান।

৫. বাচ্চাদের চিকেন পক্স হলে কী খাওয়া উচিত? সহজপাচ্য, নরম ও ঠান্ডা বা কুসুম গরম খাবার এবং প্রচুর তরল। মুখে ফোস্কা থাকলে ঝাল ও টক এড়ান।

৬. শিশুদের চিকেন পক্সের ক্রিম বা ওষুধ কী? ক্যালামাইন জাতীয় লোশন বা অন্য ওষুধ ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে ব্যবহার করুন। অ্যাসপিরিন কখনোই নয়।

৭. বড়দের চিকেন পক্স হলে কী করবেন? বড়দের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, তাই দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তার প্রয়োজনে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিতে পারেন।

৮. কখন হাসপাতালে নিতে হবে? শ্বাসকষ্ট, তীব্র জ্বর, নিস্তেজ ভাব, বারবার বমি, ফোস্কায় পুঁজ বা শিশুর বয়স ১ বছরের কম হলে।

Leave a Reply