নবজাতকের জন্ডিস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

নবজাতকের জন্ডিস একটি সাধারণ ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরীহ অবস্থা, যেখানে নবজাতকের ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদাভ দেখায়। এটি বিশেষত অকালপ্রসূত (৩৮ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া) এবং কিছু বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুর ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। জন্মের প্রথম কয়েক দিনে অনেক শিশুর মধ্যেই এটি স্বাভাবিকভাবে দেখা দিতে পারে, তবে সঠিক সময়ে লক্ষণ চিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি — কারণ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা না করালে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নবজাতকের জন্ডিস কী এবং কেন হয়?
শরীরে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার সময় বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ রঙের পদার্থ তৈরি হয়। সাধারণত লিভার এই বিলিরুবিন রক্ত থেকে ছেঁকে অন্ত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু নবজাতকের লিভার তখনো পুরোপুরি পরিণত হয় না, তাই তা পর্যাপ্ত দ্রুততায় বিলিরুবিন অপসারণ করতে পারে না। ফলে রক্তে বিলিরুবিন জমা হয়ে ত্বক ও চোখে হলুদ আভা তৈরি করে। এই ধরনের জন্ডিস সাধারণত জন্মের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে দেখা দেয় এবং একে শারীরবৃত্তীয় জন্ডিস বলা হয়।
নবজাতকের জন্ডিসের প্রকারভেদ
শারীরবৃত্তীয় (Physiological) জন্ডিস
জন্মের ২-৩ দিন পর দেখা দেয় এবং লিভারের স্বাভাবিক অপরিপক্বতার কারণে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নিজে থেকেই ১-২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়।
স্তন্যপান-সম্পর্কিত (Breastfeeding) জন্ডিস
জন্মের প্রথম সপ্তাহে দেখা দেয়, যখন শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ পায় না বা মায়ের দুধ আসতে দেরি হয়।
বুকের দুধের (Breast Milk) জন্ডিস
বুকের দুধে থাকা কিছু উপাদান বিলিরুবিন ভাঙনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এটি সাধারণত জন্মের ৭ দিন পর শুরু হয় এবং ২-৩ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
নবজাতকের জন্ডিসের অন্তর্নিহিত কারণসমূহ
কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণেও নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে, যেমন:
- মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপে অমিল (রিসাস বা ABO অসঙ্গতি)
- সিকল সেল অ্যানিমিয়ার মতো লোহিত রক্তকণিকার অস্বাভাবিকতা
- কঠিন প্রসবের কারণে মাথার ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ (সেফালোহেমাটোমা)
- রক্তপ্রবাহে সংক্রমণ (সেপসিস) বা অন্যান্য ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ
- লিভারের সমস্যা বা পিত্তনালীতে বাধা
- হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা কম হওয়া)
- এনজাইমের ঘাটতি
- যমজ বা স্বল্প ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে লোহিত রক্তকণিকার সংখ্যা বেশি হওয়া
এই কারণগুলোর যেকোনোটি সন্দেহ হলে চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় করেন।
নবজাতকের জন্ডিসের লক্ষণ ও উপসর্গ
সাধারণ লক্ষণ
- ত্বক ও চোখের সাদা অংশে হলুদ আভা — সাধারণত প্রথমে মুখে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বুক, পেট, হাত-পায়ে ছড়ায়
- অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা
- বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুর মলে হালকা সবুজ-হলুদ আভা, বা ফর্মুলা খাওয়ানো শিশুর ক্ষেত্রে সবুজ-সরিষা রঙের মল
- প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হওয়া (স্বাভাবিকভাবে নবজাতকের প্রস্রাব প্রায় বর্ণহীন থাকা উচিত)
গুরুতর লক্ষণ — এখনই ডাক্তার দেখান
- ঠিকমতো খাওয়াতে না পারা বা খাওয়ানোয় অনীহা
- ভেজা ন্যাপি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া
- জাগানো কঠিন হওয়া বা অতিরিক্ত নিস্তেজ ভাব
- অবিরাম কান্না বা অস্বাভাবিক উচ্চস্বরে কান্না
- শরীর বা ঘাড় পেছনের দিকে বেঁকে যাওয়া (arching), শরীর শক্ত বা অতিরিক্ত নেতিয়ে পড়া
- চোখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া
- হলুদ আভা পেট বা হাত-পায়ে ছড়িয়ে পড়া
- ওজন বাড়াতে ব্যর্থ হওয়া
- জ্বর
গুরুত্বপূর্ণ: এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখলে দেরি না করে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
কোন নবজাতকদের ঝুঁকি বেশি?
- ৩৮ সপ্তাহের আগে জন্ম নেওয়া (অকালপ্রসূত) শিশু
- প্রসবের সময় শারীরিক আঘাত বা কঠিন প্রসবের শিকার শিশু
- মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপ ভিন্ন হলে
- যমজ বা স্বল্প ওজনের শিশু
- পরিবারে আগে জন্ডিসের ইতিহাস থাকলে
চিকিৎসা না করালে কী জটিলতা হতে পারে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নবজাতকের জন্ডিস নিরাপদে সেরে যায়, তবে বিলিরুবিনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে চিকিৎসা না করালে বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা হতে পারে:
- তীব্র বিলিরুবিন এনসেফালোপ্যাথি (ABE) — বিলিরুবিন মস্তিষ্কের কোষে প্রবেশ করলে এই অবস্থা দেখা দেয়। লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে অলসতা, উচ্চস্বরে কান্না, খাওয়াতে সমস্যা, শরীর বেঁকে যাওয়া ও জ্বর। দ্রুত চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
- কার্নিক্টেরাস (Kernicterus) — চিকিৎসা না করালে ABE থেকে যে স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে তাকে কার্নিক্টেরাস বলা হয়, যার ফলে সেরিব্রাল পালসি জাতীয় নড়াচড়ার সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং দাঁতের এনামেল বিকাশে সমস্যা হতে পারে।
এই কারণেই সময়মতো নির্ণয় ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নবজাতকের জন্ডিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক সাধারণত চোখে দেখেই প্রাথমিক অনুমান করতে পারেন, তবে সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পরীক্ষা করা হতে পারে:
- রক্ত পরীক্ষা — বিলিরুবিনের মাত্রা ও ধরন যাচাই করতে
- ট্রান্সকিউটেনিয়াস বিলিরুবিনোমিটার — ত্বকে আলো ফেলে অ-আক্রমণাত্মকভাবে বিলিরুবিনের মাত্রা পরিমাপ করার যন্ত্র
- সম্পূর্ণ রক্ত গণনা (CBC) ও রেটিকুলোসাইট কাউন্ট — লোহিত রক্তকণিকা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য
- রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা ও কুম্বস টেস্ট — মা-শিশুর রক্তের সামঞ্জস্য ও ইমিউন প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য
- লিভার ফাংশন টেস্ট ও প্রয়োজনে প্রস্রাব/সংক্রমণ পরীক্ষা
নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা পদ্ধতি
তীব্রতা ও অন্তর্নিহিত কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন শিশুর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া হবে নাকি সক্রিয় চিকিৎসা শুরু করা হবে:
- খাওয়ানোর পরিমাণ বাড়ানো — বেশি ঘন ঘন বুকের দুধ বা ফর্মুলা খাওয়ালে শিশুর মলত্যাগ বাড়ে, যা শরীর থেকে বিলিরুবিন দ্রুত বের করতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে চিকিৎসক ফর্মুলা সম্পূরক করার পরামর্শ দিতে পারেন।
- ফটোথেরাপি (হালকা থেরাপি) — শিশুকে একটি বিশেষ নিরাপদ আলোর নিচে রাখা হয়, যা বিলিরুবিনের গঠন পরিবর্তন করে শরীর থেকে বের হতে সাহায্য করে।
- বিনিময় রক্তদান (Exchange Transfusion) — অত্যন্ত গুরুতর ক্ষেত্রে, যখন ফটোথেরাপিতে কাজ না হয়, তখন নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (NICU) এই চিকিৎসা নিতে পারে।
- ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবুলিন (IVIG) — রক্তের গ্রুপ অসামঞ্জস্যের কারণে জন্ডিস হলে এই চিকিৎসা মায়ের অ্যান্টিবডির প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এই সবকটি সিদ্ধান্তই সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল — বাড়িতে নিজে থেকে কোনো চিকিৎসা প্রয়োগ করা উচিত নয়।
নবজাতকের জন্ডিস প্রতিরোধে করণীয়
জন্ডিস সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই, তবে ঝুঁকি কমাতে ও দ্রুত শনাক্ত করতে করণীয়:
- গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করিয়ে রাখা
- প্রয়োজনে জন্মের পর শিশুর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা
- জন্মের প্রথম কয়েক দিনে শিশুকে দিনে ৮-১২ বার পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো, যা শিশুকে হাইড্রেটেড রাখে ও বিলিরুবিন দ্রুত অপসারণে সাহায্য করে
- প্রসবের পর প্রথম পাঁচ দিন ত্বক ও চোখে হলুদ আভার লক্ষণের জন্য নিয়মিত লক্ষ্য রাখা
- কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
নবজাতকের জন্ডিস কি সব সময় বিপজ্জনক? না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সাময়িক ও নিরীহ এবং ১-২ সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি, কারণ বিরল ক্ষেত্রে এটি গুরুতর হতে পারে।
নবজাতকের জন্ডিস কতদিনে সারে? শারীরবৃত্তীয় জন্ডিস সাধারণত ১-২ সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। বুকের দুধের জন্ডিস কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
ফটোথেরাপি কি নিরাপদ? ফটোথেরাপি একটি সাধারণ ও চিকিৎসাগতভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি, যা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে করানো হয়। এটি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, তবে যেকোনো প্রশ্নে চিকিৎসকের সাথে সরাসরি আলোচনা করুন।
উপসংহার ও পরবর্তী পদক্ষেপ
নবজাতকের জন্ডিস একটি সাধারণ ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরীহ অবস্থা, তবে সময়মতো লক্ষণ চেনা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক বা চোখে হলুদ আভা, খাওয়ানোয় অনীহা, বা অতিরিক্ত নিস্তেজ ভাবের মতো লক্ষণ দেখলে দেরি না করে যোগাযোগ করুন।

মেডিকেল রিভিউ করেছেন প্রফেসর ডা. মো. মজিবুর রহমান (মুজিব), MBBS, DCH, FCPS (নিওনেটোলজি), FRCP এডিন. (CH)
আপনার নবজাতকের মধ্যে জন্ডিসের কোনো লক্ষণ দেখলে আজই যোগাযোগ করুন — Bangladesh Nobojatok Hospital, Signboard Mor, Shiddhirgonj, Narayanganj-1430 | ☎ +880 1817-777722।

1 thought on “নবজাতকের জন্ডিস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা”