নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস একটি স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেল নামক গহ্বরে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (CSF) স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জমা হয়। এই অতিরিক্ত তরল মাথার খুলির ভেতরে চাপ তৈরি করে, যা মস্তিষ্কের বিকাশ ও কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। নবজাতকের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই জন্মগত (জন্মের সময় থেকেই উপস্থিত) হয়ে থাকে, এবং সময়মতো শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস কী?

মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকেলগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড ধারণ করে, যা মস্তিষ্ককে সুরক্ষা দেয় ও পুষ্টি সরবরাহে সাহায্য করে। কিন্তু এই তরল উৎপাদন, প্রবাহ বা শোষণে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে তা ভেন্ট্রিকেলে জমতে শুরু করে, ভেন্ট্রিকেল বড় হয়ে যায় এবং আশেপাশের মস্তিষ্কের টিস্যুতে চাপ সৃষ্টি করে।

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাসের প্রকারভেদ

  • যোগাযোগকারী (Communicating) হাইড্রোসেফালাস — ভেন্ট্রিকেলের বাইরে CSF প্রবাহে বাধা তৈরি হয়, তবে ভেন্ট্রিকেলগুলোর মধ্যে তরল চলাচল স্বাভাবিক থাকে
  • নন-কমিউনিকেটিং (Obstructive) হাইড্রোসেফালাস — ভেন্ট্রিকেলের সংযোগকারী সরু পথে বাধা তৈরি হয়; নবজাতকদের মধ্যে এর একটি সাধারণ কারণ অ্যাক্যুডাক্টাল স্টেনোসিস (সিলভিয়াসের জলজ পথের সংকীর্ণতা)
  • জন্মগত (Congenital) হাইড্রোসেফালাস — জন্মের সময় থেকেই উপস্থিত থাকে; ভ্রূণের বিকাশজনিত বা জেনেটিক কারণে হতে পারে — নবজাতকের ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাসের লক্ষণ

সবচেয়ে লক্ষণীয় লক্ষণ — মাথার আকার

নবজাতকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ার মতো লক্ষণ হলো মাথার আকার শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বেড়ে যাওয়া। নিয়মিত ওজন ও মাথার পরিধি পরিমাপের সময় এটি চিকিৎসক বা অভিভাবকের নজরে আসতে পারে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ

  • মাথার উপরের নরম স্থান (ফন্টানেল) ফুলে থাকা বা টানটান মনে হওয়া
  • মাথার ত্বকে শিরা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠা
  • চোখ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা (“সূর্যাস্ত চোখ” নামে পরিচিত এই লক্ষণ)
  • অতিরিক্ত খিটখিটে ভাব ও অস্বাভাবিক কান্নাকাটি
  • খাওয়াতে সমস্যা বা ঘন ঘন বমি হওয়া
  • খিঁচুনি
  • অস্বাভাবিক নিস্তেজ ভাব বা সতর্কতার অভাব

গুরুত্বপূর্ণ: এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখলে দেরি না করে শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিওনাটোলজিস্টের পরামর্শ নিন।

নবজাতকের জন্মগত হাইড্রোসেফালাসের কারণ

  • স্নায়ু টিউব ত্রুটি (Neural tube defects)
  • অ্যাক্যুডাক্টাল স্টেনোসিস
  • ড্যান্ডি-ওয়াকার সিন্ড্রোম
  • চিয়ারি ম্যালফরমেশন
  • গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রমণ — যেমন টক্সোপ্লাজমোসিস, সাইটোমেগালোভাইরাস, রুবেলা বা সিফিলিস
  • জন্মের সময় বা তার আশেপাশে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (বিশেষত প্রি-ম্যাচিউর শিশুদের ক্ষেত্রে ইনট্রাভেন্ট্রিকুলার হেমোরেজ)

কোন নবজাতকদের ঝুঁকি বেশি?

  • যেসব শিশুর পরিবারে স্পাইনা বিফিডার মতো নিউরাল টিউব ত্রুটির ইতিহাস আছে
  • প্রি-ম্যাচিউর (সময়ের আগে জন্ম নেওয়া) শিশু
  • গর্ভাবস্থায় মা নির্দিষ্ট সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন এমন শিশু
  • জন্মের সময় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে এমন শিশু

চিকিৎসা না করালে কী জটিলতা হতে পারে?

মাথার খুলির ভেতরে বর্ধিত চাপ মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে, যার ফলে দেখা দিতে পারে:

  • মোটর দক্ষতা, সমন্বয় ও ভারসাম্যের সমস্যা; গুরুতর ক্ষেত্রে আংশিক বা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত
  • দৃষ্টিজনিত সমস্যা
  • খিঁচুনি
  • বিকাশগত বিলম্ব (developmental delay)
  • চিকিৎসা না করালে এটি জীবন-হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠতে পারে

এই কারণেই দ্রুত নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

  • শারীরিক ও স্নায়বিক পরীক্ষা — মাথার পরিধি পরিমাপ, ফন্টানেলের অবস্থা, রিফ্লেক্স ও সামগ্রিক স্নায়বিক কার্যকারিতা যাচাই
  • আল্ট্রাসাউন্ড — ফন্টানেল খোলা থাকা অবস্থায় নবজাতকদের ক্ষেত্রে সহজলভ্য ও নন-ইনভেসিভ পদ্ধতি
  • এমআরআই (MRI) — মস্তিষ্কের গঠনের বিস্তারিত চিত্র পাওয়ার জন্য
  • সিটি স্ক্যান (CT scan) — প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত ইমেজিংয়ের জন্য

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাসের চিকিৎসা পদ্ধতি

চিকিৎসার মূল লক্ষ্য মস্তিষ্কের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমানো। সাধারণত ব্যবহৃত পদ্ধতি:

  • শান্ট সার্জারি — সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে মস্তিষ্কে একটি পাতলা টিউব (শান্ট) স্থাপন করা হয়, যা অতিরিক্ত CSF মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অন্য অংশে (সাধারণত পেটের গহ্বরে) সরিয়ে দেয়, যেখান থেকে তা শরীর শোষণ করে নেয়।
  • এন্ডোস্কোপিক থার্ড ভেন্ট্রিকুলোস্টমি (ETV) — নির্দিষ্ট ধরনের হাইড্রোসেফালাসের ক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতি, যেখানে মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট স্থানে ছোট পথ তৈরি করে আটকে থাকা CSF-কে স্বাভাবিকভাবে শোষিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

শান্ট স্থাপনের পর নিয়মিত ফলো-আপ প্রয়োজন হয়, কারণ শিশুর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে শান্ট সামঞ্জস্য বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে নিওরোসার্জনের মূল্যায়নের ওপর।

 

কখন সাথে সাথে ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন:

  • মাথার আকার শরীরের তুলনায় দ্রুত বেড়ে যাওয়া
  • ফন্টানেল অস্বাভাবিকভাবে ফোলা বা টানটান
  • উচ্চস্বরে বা তীক্ষ্ণ কান্না যা সহজে থামছে না
  • খাওয়াতে বা চোষায় সমস্যা
  • কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া বারবার বমি হওয়া
  • খিঁচুনি
  • অস্বাভাবিক নিস্তেজ ভাব বা সাড়া কম দেওয়া

গর্ভাবস্থায় সতর্কতা ও প্রতিরোধ

হাইড্রোসেফালাস সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব নয়, তবে ঝুঁকি কমাতে করণীয়:

  • গর্ভাবস্থায় নিয়মিত প্রসবপূর্ব চেক-আপে উপস্থিত থাকা
  • সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা
  • গর্ভাবস্থায় কোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
  • প্রি-ম্যাচিউর জন্মের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশিত পর্যবেক্ষণ মেনে চলা

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস কি সবসময় জন্মগত হয়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নবজাতকদের হাইড্রোসেফালাস জন্মগত হয়ে থাকে, তবে জন্মের পর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা সংক্রমণের কারণেও এটি অর্জিতভাবে দেখা দিতে পারে।

শান্ট সার্জারি কি ঝুঁকিপূর্ণ? যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো এতেও ঝুঁকি থাকে, তবে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি। নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে আপনার নিওরোসার্জনের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করুন।

সময়মতো চিকিৎসা করালে নবজাতকের স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব কি? সময়মতো নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করলে অনেক শিশুই স্বাভাবিক বা কাছাকাছি স্বাভাবিক বিকাশ অর্জন করতে পারে। ফলাফল নির্ভর করে অন্তর্নিহিত কারণ, চিকিৎসার সময় ও নিয়মিত ফলো-আপের ওপর।

উপসংহার ও পরবর্তী পদক্ষেপ

নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস একটি গুরুতর তবে চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। মাথার আকার দ্রুত বেড়ে যাওয়া, ফন্টানেল ফোলা, বা ঘন ঘন বমির মতো লক্ষণ দেখলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞ বা নিওরোসার্জনের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সময়মতো নির্ণয় ও চিকিৎসা শিশুর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

Professor-Dr.-Md-Mozibur-Rahman
Professor-Dr.-Md-Mozibur-Rahman

মেডিকেল রিভিউ করেছেন প্রফেসর ডা. মো. মজিবুর রহমান (মুজিব), MBBS, DCH, FCPS (নিওনেটোলজি), FRCP এডিন. (CH)  

আপনার নবজাতকের মধ্যে হাইড্রোসেফালাসের কোনো লক্ষণ দেখলে দেরি না করে যোগাযোগ করুন — Bangladesh Nobojatok Hospital, Signboard Mor, Shiddhirgonj, Narayanganj-1430 | ☎ +880 1817-777722।

1 thought on “নবজাতকের হাইড্রোসেফালাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

Leave a Reply