নবজাতকের গ্যাস্ট্রোস্কিসিস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

গ্যাস্ট্রোস্কিসিস একটি জন্মগত পেটের প্রাচীরের ত্রুটি, যেখানে নাভির পাশে পেটের প্রাচীরে একটি ছিদ্র থাকে এবং এর মধ্য দিয়ে অন্ত্র (কখনো অন্যান্য অঙ্গও) শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে। এটি একটি বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা, যার জন্য জন্মের পরপরই বিশেষায়িত নবজাতক সার্জারি টিমের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় সময়মতো নির্ণয় ও পরিকল্পিত প্রসবের মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস কী?
গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের পেটের প্রাচীর সম্পূর্ণভাবে গঠিত না হলে গ্যাস্ট্রোস্কিসিস দেখা দেয়। সাধারণত নাভির ঠিক ডান পাশে একটি ছিদ্র থেকে যায়, যার মধ্য দিয়ে অন্ত্র শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসে। ওমফালোসিলের বিপরীতে, গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে বাইরে বেরিয়ে আসা অঙ্গগুলোর কোনো প্রতিরক্ষামূলক আবরণ (sac) থাকে না — এগুলো সরাসরি অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের সংস্পর্শে থাকে।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস ও ওমফালোসিলের মধ্যে পার্থক্য
এই দুটি জন্মগত পেটের প্রাচীরের ত্রুটি প্রায়ই একে অপরের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, তবে এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:
| বৈশিষ্ট্য | গ্যাস্ট্রোস্কিসিস | ওমফালোসিল |
|---|---|---|
| আবরণ (Sac) | নেই — অঙ্গ সরাসরি উন্মুক্ত | থাকে — একটি পাতলা ঝিল্লি অঙ্গকে ঢেকে রাখে |
| ত্রুটির অবস্থান | সাধারণত নাভির ডান পাশে | নাভির ঠিক কেন্দ্রে |
| অন্য জন্মগত ত্রুটির সাথে সম্পর্ক | সাধারণত একক সমস্যা হিসেবে দেখা যায় | প্রায়ই অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি বা ক্রোমোজোমাল সমস্যার সাথে যুক্ত থাকতে পারে |
সঠিক পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড ও বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অপরিহার্য, কারণ চিকিৎসা পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের কারণ ও ঝুঁকির কারণ
গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের সঠিক কারণ এখনো সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি, তবে কিছু ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
- অল্প বয়সে মাতৃত্ব — বিশেষত ২০ বছরের কম বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি
- গর্ভাবস্থায় ধূমপান বা মাদক গ্রহণ
- গর্ভাবস্থায় অ্যালকোহল সেবন
- নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় ব্যবহার (চিকিৎসকের সাথে আলোচনা ছাড়া কোনো ওষুধ নেওয়া উচিত নয়)
- পরিবেশগত কারণ — এখনো গবেষণাধীন
গুরুত্বপূর্ণ: এই ঝুঁকির কারণ থাকা মানেই গ্যাস্ট্রোস্কিসিস হবে তা নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রেই কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই এটি ঘটে। গর্ভবতী মায়েদের অযথা নিজেকে দোষারোপ করার প্রয়োজন নেই।
গর্ভাবস্থায় গ্যাস্ট্রোস্কিসিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
- প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ড — সাধারণত দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের রুটিন স্ক্রিনিং আল্ট্রাসাউন্ডে শনাক্ত হয়
- মাতৃ সিরাম আলফা-ফেটোপ্রোটিন (AFP) পরীক্ষা — গ্যাস্ট্রোস্কিসিস থাকলে এই মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে
- নিয়মিত ফলো-আপ আল্ট্রাসাউন্ড — গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি ও অন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য
প্রসবপূর্ব নির্ণয় হলে মাতৃ-ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ (maternal-fetal medicine specialist) ও নবজাতক সার্জারি টিমের সমন্বয়ে প্রসব-পরিকল্পনা তৈরি করা হয়, যা ফলাফল উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নির্ণয় হলে প্রসব-পরিকল্পনা
- এমন একটি হাসপাতালে প্রসবের পরিকল্পনা করা হয় যেখানে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (NICU) ও নবজাতক সার্জারি সুবিধা উপলব্ধ
- প্রসবের পদ্ধতি (স্বাভাবিক না সিজারিয়ান) নির্ভর করে সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর — গ্যাস্ট্রোস্কিসিস একাই সবসময় সিজারিয়ানের কারণ নয়, এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল
- জন্মের সাথে সাথেই নবজাতক সার্জারি টিম প্রস্তুত থাকে যাতে দ্রুত মূল্যায়ন ও চিকিৎসা শুরু করা যায়
জন্মের পর গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের লক্ষণ
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস জন্মের সময়ই দৃশ্যমান — অন্ত্র (এবং কখনো পাকস্থলী বা অন্যান্য অঙ্গ) পেটের প্রাচীরের ছিদ্র দিয়ে বাইরে বেরিয়ে থাকে। এটি প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ডে আগে থেকেই শনাক্ত না হলেও জন্মের সাথে সাথেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, তাই জন্মের মুহূর্তেই চিকিৎসা শুরু হয়ে যায়।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের চিকিৎসা — অস্ত্রোপচার পদ্ধতি
চিকিৎসার লক্ষ্য বাইরে থাকা অঙ্গগুলো নিরাপদে পেটের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে প্রাচীর বন্ধ করা। পদ্ধতি নির্ভর করে ত্রুটির আকার ও অন্ত্রের অবস্থার ওপর:
- প্রাইমারি ক্লোজার (Primary Closure) — যদি অন্ত্র খুব বেশি ফোলা না থাকে, জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই একবারে অস্ত্রোপচার করে পেট বন্ধ করা যায়
- স্টেজড ক্লোজার (Staged Closure / Silo) — যদি অন্ত্র ফোলা বা পেটের গহ্বর ছোট হয়, তাহলে প্রথমে একটি সুরক্ষিত ব্যাগ (সাইলো)-এ অঙ্গগুলো রাখা হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে সেগুলো পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে পরে সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়
অস্ত্রোপচারের পর নবজাতকের সাধারণত দীর্ঘ সময় NICU-তে থাকার প্রয়োজন হয়, যেখানে শিরায় (IV) পুষ্টি, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও ধীরে ধীরে মুখে খাওয়ানো শুরু করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।
সম্ভাব্য জটিলতা
- অন্ত্রের ক্ষতি বা সংকীর্ণতা (Intestinal atresia) — অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের দীর্ঘ সংস্পর্শে অন্ত্রের প্রদাহ বা ক্ষতি হতে পারে
- সংক্রমণ — উন্মুক্ত অঙ্গের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে
- খাওয়ানোয় বিলম্ব — অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করতে সময় নিতে পারে
- শর্ট বাওয়েল সিনড্রোম — বিরল ক্ষেত্রে, বিশেষত অন্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে
- দীর্ঘ হাসপাতাল-বাস — জটিলতার ওপর নির্ভর করে সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে
জন্মের পর সম্ভাব্যতা ও দীর্ঘমেয়াদী যত্ন
আধুনিক নবজাতক সার্জারি ও নিবিড় পরিচর্যায় গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলাফল অর্জন করে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধৈর্য প্রয়োজন হতে পারে, কারণ:
- অন্ত্র সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করতে কয়েক সপ্তাহ সময় নিতে পারে
- খাওয়ানো ধীরে ধীরে ও পর্যায়ক্রমে শুরু করা হয়
- জন্মের পর নিয়মিত ফলো-আপ ও কখনো কখনো পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস কি বংশগত?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি বংশগত নয় এবং পরিবারে পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি সাধারণত কম। তবে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জেনেটিক কাউন্সেলিং সহায়ক হতে পারে।
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নির্ণয় হলে কি স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব?
এটি নির্ভর করে সামগ্রিক গর্ভাবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর। গ্যাস্ট্রোস্কিসিস একাই সবসময় সিজারিয়ান বাধ্যতামূলক করে না — আপনার মাতৃ-ভ্রূণ বিশেষজ্ঞের সাথে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
অস্ত্রোপচারের পর শিশু কতদিনে বাড়ি ফিরতে পারবে?
এটি নির্ভর করে ত্রুটির তীব্রতা, অন্ত্রের অবস্থা ও জটিলতার ওপর। সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আপনার নবজাতক সার্জন ভালো বলতে পারবেন।
উপসংহার ও পরবর্তী পদক্ষেপ
গ্যাস্ট্রোস্কিসিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জন্মগত ত্রুটি হলেও, প্রসবপূর্ব নির্ণয়, পরিকল্পিত প্রসব এবং দক্ষ নবজাতক সার্জারি টিমের যত্নে অধিকাংশ শিশুই সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে। গর্ভাবস্থায় আল্ট্রাসাউন্ডে কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং একটি সুসংগঠিত প্রসব-পরিকল্পনা তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গর্ভাবস্থায় গ্যাস্ট্রোস্কিসিস বা অন্য কোনো জন্মগত ত্রুটি নির্ণয় হলে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন — Bangladesh Nobojatok Hospital, Signboard Mor, Shiddhirgonj, Narayanganj-1430 | ☎ +880 1817-777722।
