নবজাতকের ফটোথেরাপি
নবজাতকের ফটোথেরাপি: প্রক্রিয়া ও যত্ন
নবজাতকের জন্ডিসের কথা শুনলেই অনেক অভিভাবকের মনে প্রথম যে চিকিৎসার নাম আসে তা হলো ফটোথেরাপি — বিশেষ নীল আলোর নিচে শিশুকে রাখার একটি পদ্ধতি। নামটা পরিচিত হলেও, প্রক্রিয়াটি আসলে কীভাবে কাজ করে, কতটা নিরাপদ, এবং এই সময় বাবা-মায়ের কী করণীয় — তা নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এই আর্টিকেলে ফটোথেরাপির পুরো প্রক্রিয়া বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ফটোথেরাপি কী?
ফটোথেরাপি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ব্যবহার করে নবজাতকের রক্তে অতিরিক্ত বিলিরুবিনের মাত্রা কমানো হয়। এটি জন্ডিসের সবচেয়ে সাধারণ ও কার্যকর চিকিৎসাগুলোর একটি, এবং সারা বিশ্বে দশকের পর দশক ধরে নিরাপদে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ফটোথেরাপি কীভাবে কাজ করে?
বিলিরুবিন একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের নীল-সবুজ আলো শোষণ করলে তার আণবিক গঠন পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তিত রূপ পানিতে সহজে দ্রবণীয় হয়ে ওঠে, যার ফলে শিশুর লিভার একে সহজে প্রক্রিয়াজাত করতে পারে এবং তা প্রস্রাব ও মলের মাধ্যমে শরীর থেকে দ্রুত বের হয়ে যায়। সংক্ষেপে — আলো বিলিরুবিনকে এমন একটি রূপে পরিবর্তন করে, যা শরীরের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় সহজে অপসারণযোগ্য হয়ে ওঠে।
কখন ফটোথেরাপি প্রয়োজন হয়?
চিকিৎসক নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে ফটোথেরাপির প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করেন:
- রক্তে বিলিরুবিনের নির্দিষ্ট মাত্রা (যা শিশুর বয়স ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে)
- বিলিরুবিনের মাত্রা কত দ্রুত বাড়ছে
- শিশুর জন্মের সময় (প্রি-ম্যাচিউর কিনা)
- জন্ডিসের অন্তর্নিহিত কারণ
এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন ও রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে — বাবা-মায়ের নিজে থেকে অনুমান করার প্রয়োজন নেই।
ফটোথেরাপির ধরন
কনভেনশনাল (প্রচলিত) ফটোথেরাপি
শিশুকে একটি ইনকিউবেটর বা কট-এ শুইয়ে ওপর থেকে বিশেষ নীল আলোর নিচে রাখা হয়। এটি সবচেয়ে সাধারণ ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত পদ্ধতি।
ফাইবার অপটিক / বিলিব্ল্যাংকেট ফটোথেরাপি
একটি আলোকিত প্যাড বা কম্বলের মতো যন্ত্র সরাসরি শিশুর শরীরের সাথে (সাধারণত পিঠে বা নিচে) জড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি প্রায়ই বাড়িতে ব্যবহারের জন্য বা হালকা জন্ডিসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, কারণ এতে শিশুকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজন হয় না।
ইনটেনসিভ/ডাবল ফটোথেরাপি
বিলিরুবিনের মাত্রা বেশি বা দ্রুত বাড়তে থাকলে, একই সাথে একাধিক আলোর উৎস (যেমন ওপর থেকে কনভেনশনাল আলো ও নিচে বিলিব্ল্যাংকেট) ব্যবহার করে চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানো হয়।
ফটোথেরাপির সময় কী ঘটে — ধাপে ধাপে
- শিশুকে শুধু ডায়াপার পরিয়ে (যাতে শরীরের সর্বাধিক অংশ আলোর সংস্পর্শে আসে) ইনকিউবেটর বা বিশেষ বিছানায় রাখা হয়
- চোখ সুরক্ষার জন্য বিশেষ নরম আই-প্যাচ বা চশমা পরানো হয়
- শিশুকে নিয়মিত বিরতিতে (সাধারণত প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর) খাওয়ানোর জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বের করা হয়
- নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বিলিরুবিনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে চিকিৎসা কতদিন প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যায়
- সাধারণত ১-২ দিনের মধ্যে বিলিরুবিনের মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নেমে এলে চিকিৎসা বন্ধ করা হয়
নিরাপত্তা ব্যবস্থা — চোখ ও শরীরের সুরক্ষা
- চোখের সুরক্ষা — ফটোথেরাপির পুরো সময় জুড়ে শিশুর চোখ প্যাচ বা বিশেষ চশমা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, কারণ উজ্জ্বল আলো চোখের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে
- শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ — ইনকিউবেটরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়, যাতে শিশু অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা না হয়ে যায়
- তরল গ্রহণ পর্যবেক্ষণ — ফটোথেরাপির সময় শরীর থেকে তরল ক্ষয় বাড়তে পারে, তাই খাওয়ানোর পরিমাণ ও ভেজা ন্যাপির সংখ্যা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়
সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
ফটোথেরাপি সাধারণত নিরাপদ, তবে কিছু সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে:
- ত্বকে হালকা র্যাশ
- সাধারণের চেয়ে বেশি আলগা বা ঘন ঘন মলত্যাগ (বিলিরুবিন অপসারণের স্বাভাবিক অংশ)
- শরীর থেকে তরল ক্ষয় বেড়ে যাওয়া, যার জন্য বাড়তি খাওয়ানোর প্রয়োজন হতে পারে
- সাময়িক অস্থিরতা বা ঘুমের ধরনে পরিবর্তন
এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণত চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর নিজে থেকেই কমে যায়।
ফটোথেরাপির সময় ও পরে বাড়িতে যত্ন
- চিকিৎসকের নির্দেশিত সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত খাওয়ান — ঘন ঘন খাওয়ানো বিলিরুবিন দ্রুত অপসারণে সাহায্য করে
- ভেজা ন্যাপির সংখ্যা লক্ষ্য রাখুন, যাতে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত হয়
- চিকিৎসকের নির্ধারিত ফলো-আপ রক্ত পরীক্ষায় উপস্থিত থাকুন, এমনকি ত্বকের হলুদ ভাব কমে গেছে মনে হলেও
- বাড়িতে ফটোথেরাপি চললে যন্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করুন
বাড়িতে ফটোথেরাপি কি সম্ভব?
হালকা থেকে মাঝারি জন্ডিসের কিছু ক্ষেত্রে, চিকিৎসক বিলিব্ল্যাংকেট জাতীয় যন্ত্র দিয়ে বাড়িতে ফটোথেরাপির পরামর্শ দিতে পারেন, বিশেষত যখন:
- বিলিরুবিনের মাত্রা তীব্র নয়
- শিশু অন্যথায় সুস্থ ও ভালোভাবে খাচ্ছে
- নিয়মিত ফলো-আপ পরীক্ষা করানো সম্ভব
এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল — নিজে থেকে বাড়িতে ফটোথেরাপি যন্ত্র সংগ্রহ করে ব্যবহার শুরু করবেন না।
কেন বেছে নেবেন নবজাতক হাসপাতাল?
নবজাতক হাসপাতালে রয়েছে ৫০+ নিওনেটোলজি বিশেষজ্ঞ, ২০+ শিশু ও নিওনেটোলজি বিশেষজ্ঞ, এবং ৫+ গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ (নারী চিকিৎসকসহ) — সবাই এক ছাদের নিচে। হাসপাতালের নেতৃত্বে আছেন প্রফেসর ডা. মো. মজিবুর রহমান (মুজিব), MBBS, DCH, FCPS (নিওনেটোলজি), FRCP এডিন. (CH) — একজন অভিজ্ঞ ও স্বীকৃত নিওনেটোলজিস্ট। গর্ভাবস্থা ও প্রসব থেকে শুরু করে নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা পর্যন্ত, প্রতিটি ধাপে পরিবারগুলো পায় ধারাবাহিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ফটোথেরাপি কি ব্যথাদায়ক? না, ফটোথেরাপি ব্যথাহীন। শিশু আলোর নিচে থাকাকালীন কিছুটা অস্বস্তি বা অস্থিরতা দেখাতে পারে, তবে এটি একটি নন-ইনভেসিভ (কোনো সুচ বা কাটাছেঁড়া ছাড়া) পদ্ধতি।
ফটোথেরাপির সময় কি বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হয়? না, বরং ফটোথেরাপির সময় নিয়মিত ও ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া উচিত — এটি বিলিরুবিন দ্রুত অপসারণে সাহায্য করে। খাওয়ানোর সময় সংক্ষিপ্তভাবে আলো থেকে সরিয়ে আনা স্বাভাবিক অংশ।
ফটোথেরাপি সম্পূর্ণ হতে সাধারণত কতদিন লাগে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১-২ দিনের মধ্যে বিলিরুবিনের মাত্রা নিরাপদ পর্যায়ে নেমে আসে, তবে এটি সম্পূর্ণভাবে প্রাথমিক বিলিরুবিনের মাত্রা ও শিশুর প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। নির্দিষ্ট সময়সীমা আপনার চিকিৎসক ভালো বলতে পারবেন।
উপসংহার ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ফটোথেরাপি নবজাতকের জন্ডিসের একটি নিরাপদ, সুপ্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপকভাবে কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে এবং এই সময় কী আশা করা যায় তা জানা থাকলে অভিভাবকদের জন্য পুরো অভিজ্ঞতাটি অনেক কম উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। আপনার শিশুর ফটোথেরাপি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে দ্বিধা না করে চিকিৎসা দলের সাথে কথা বলুন।

মেডিকেল রিভিউ করেছেন প্রফেসর ডা. মো. মজিবুর রহমান (মুজিব), MBBS, DCH, FCPS (নিওনেটোলজি), FRCP এডিন. (CH)
আপনার নবজাতকের জন্ডিস বা ফটোথেরাপি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগ করুন — Bangladesh Nobojatok Hospital, Signboard Mor, Shiddhirgonj, Narayanganj-1430 | ☎ +880 1817-777722।
